২০শে এপ্রিল, ২০২৬, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩

দেশের অর্থনীতি ‘শূন্য’ না, বরং শূন্যেরও নিচে: ইউনূস

লন্ডনের চ্যাথাম হাউসে বুধবার রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের সংলাপে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের ফেইসবুক। ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ”এখন পরিস্থিতি একটু বদলেছে। আমরা এখন সবাইকে কাছে টানছি।”দেশের অর্থনীতি ‘শূন্য’ না, বরং শূন্যেরও নিচে: ইউনূস ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ‘ঘুষ, দুর্নীতি ও পাচারের’ কারণে দেশের অর্থনীতির ভয়াবহ খারাপ অবস্থায় পৌঁছানোর কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, “অর্থনীতি ‘শূন্য’ না, বরং শূন্যেরও নিচে। বিশাল পরিমাণ দেনা রয়েছে। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ শেষ। ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধসে পড়েছে।” যুক্তরাজ্য সফরের দ্বিতীয় দিন বুধবার লন্ডনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স আয়োজিত সংলাপে অংশ নেন তিনি। সংলাপে বক্তব্য দেওয়ার পর প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন, আওয়ামী লীগ, অর্থনীতি, দুর্নীতি, প্রবাসীদের অবদানসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। ’বিশাল দেনার চাপায় অর্থনীতি’ অর্থনীতির বিষয়ে এক প্রশ্নে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এটাই আসলে আমাদের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব যখন অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থায় আছে, তখন আমাদের দেশের অর্থনীতি ‘শূন্য’ না, বরং শূন্যেরও নিচে। বিশাল পরিমাণ দেনা রয়েছে। “আগের সরকার ঘুষ খাওয়ার জন্য যেসব মেগা প্রকল্প নিয়েছিল সেগুলো পরিশোধের সময় এসেছে। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো অর্থ নেই। ব্যাংক, নন-ব্যাংক সব উৎস থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বের করে ফেলা হয়েছে বলে টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে এসেছে। এটা নথিভুক্তভাবে প্রমাণসহ তুলে ধরা হয়েছে।” আগের সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে নানা কায়দায় অর্থ বের করে নেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ”বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ শেষ। ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধসে পড়েছে। পদ্ধতিটা ছিল খুব সহজ– পর্ষদকে (ব্যাংকের পরিচালকদের) হুমকি দিয়ে পদত্যাগ করানো, নিজের লোক বসানো, তারপর বন্ধুবান্ধবদের ঋণ দেওয়া হয় কোনো জামানত ছাড়াই। আর বলেই দেওয়া হত, ‘ফেরত দিতে হবে না।’ “এই অবস্থা থেকে আমরা শুরু করেছি। এখন আমাদের বিলগুলো মেটাতে হচ্ছে, না হলে আদালতে মামলা হবে–যেটা আমাদের জন্য ভালো না।” অর্থনীতির চরম এই সঙ্কট থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা অন্তর্বর্তী সরকারকে বাঁচিয়েছে বলে তুলে ধরেন ইউনূস। বলেন, “যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ সব দেশ থেকে তারা রেমিটেন্স পাঠিয়ে গেছেন। সেই রেমিটেন্সই আমাদের বাঁচিয়েছে। এখন ব্যালেন্স অব পেমেন্ট পুরোপুরি পাল্টে গেছে।” আইএমএফ ও বৈশ্বিক সমর্থন গণ অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের তিন দিন পর দায়িত্বে আসা অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন পেয়েছে বলে সংলাপে তুলে ধরেন মুহাম্মদ ইউনূস। সঞ্চালক জানতে চান, আইএমএফ বলেছে, আগামী সরকার আসার আগেই কিছু বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। কর আদায় বাড়াতে হবে, কর জাল বড় করতে হবে। এই কাজ কী অন্তর্বর্তী সরকার করতে পারবে? উত্তরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ”সব দেশের কাছ থেকে আমরা আশ্চর্যজনক সহায়তা পেয়েছি। তারা বলেছে, অবশেষে একটা সরকার এসেছে যাদের সঙ্গে কাজ করা যাবে। যুক্তরাজ্য, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ইউএস, জাপান, চীন সবাই বলেছে, ‘যা দরকার, বলো।’ এটা আমাদের জন্য বিশাল মানসিক শক্তি ছিল। আইএমএফও সহায়তা করেছে। “আইএমএফ বলেছিল, মুদ্রার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করতে হবে। আমরা প্রথমে দুশ্চিন্তা করছিলাম, কিন্তু পরে তারা বললো– ‘তোমরা পারবে ‘। আমরা সাহস করে খুলে দিয়েছি। তেমন কিছু হয়নি। একটা স্বাভাবিক পরিবর্তন হয়েছে। এতে আমরা বুঝেছি– আমরাও পারি। তাই আইএমএফের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।” ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “এখন পরিস্থিতি একটু বদলেছে। আমরা এখন সবাইকে কাছে টানছি।” দুর্নীতি ও সংস্কারের সুযোগ দুর্নীতি নিয়ে ইউনূস বলেন, “বাংলাদেশের সর্বত্র দুর্নীতি। মানুষ, সিস্টেম, অফিস–সবখানেই। আমি যখন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গিয়েছিলাম, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট উরসুলার সঙ্গে বসে বললাম—‘এই দুর্নীতি থেকে কীভাবে বের হবে?’ তিনি হেসে বললেন– ‘আমরাও এমন জায়গা থেকে এসেছি। ইউতে যোগ দিতে চাওয়া অনেক দেশের অবস্থা ছিল আরও খারাপ।’ তারা একধরনের ক্লিনিং প্রসেস চালু করেছিল। চাপ দিয়ে, কাঠামো গড়ে তুলে দেশগুলোকে পরিষ্কার করেছে। তখনই সদস্যপদ দেয়া হত।’’ তিনি বলেন, ”ইতিহাস এখন আমাদের একটা জানালা খুলে দিয়েছে। আমরা যদি এখন না পারি, কোনোদিন পারব না। তাই এখনই সময়–সিস্টেম বদলানোর, দুর্নীতিকে নির্মূল করার, একটা নতুন বাংলাদেশ গড়ার। আমরা এমন কিছু কাজ করতে পারি যা কোনো সরকার করতে পারে না, কারণ সব সরকার পক্ষপাতদুষ্ট– তাদের সমর্থক আছে। আমাদের কোনো সমর্থক নেই, কারো ভোটের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয় না। ‘‘আমরা যাচ্ছি– এটা একদম স্পষ্ট। তাই আমাদের কাছে নৈতিক শক্তি আছে, আমরা একটা অন্তর্বর্তী সরকার। পুরোপুরি শক্তিশালী। অন্তর্বর্তী সরকার একটা ঐতিহাসিক সুযোগ। এটা একটা অসাধারণ সুযোগ।” সরকারি সেবা ও দুর্নীতি বন্ধে উদ্যোগ দুর্নীতি বন্ধে কী ধরনের কাজ করছেন এরকম প্রশ্নে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “একটা উদাহরণ দিই। আপনার পাসপোর্ট দরকার। আপনি অফিসে যান, আবেদন করেন। একজন লোক এসে বলে, ’আপনি পাসপোর্ট আবেদন করেছেন, এই পথে গেলে বছর লেগে যাবে, পাবেন না। আমার সাথে চুক্তি করেন, অমুক টাকা দেন, আমি বাসায় পৌঁছে দেব’। ওই লোকটা আসলে সেই অফিসারের প্রতিনিধি যে পাসপোর্ট ইস্যু করে। সবকিছু বাইরে থেকে দেখা নিয়ম-কানুন অনুসারে চলছে না, চলছে ওইসব প্রতিনিধিদের মাধ্যমে, যারা টাকা ভাগ করে খায়। “তখন আমরা বললাম- এইবার থেকে পাসপোর্ট অনলাইনে সরবরাহ করা হবে। লোকজন খুশি হল, ভাবলো অনলাইনে পাবে। কিন্তু যায়, দেখে কাজ করছে না। কেন? সার্ভার ডাউন। কেউ ইচ্ছা করে ডাউন করে রেখেছে। তখন আমরা একটা নতুন উদ্যোগ নিই– ‘গভর্নমেন্ট সার্ভিস সেন্টার’ না বলে বলি ‘বাংলাদেশ সার্ভিস সেন্টার’। একটা ছোট কিয়স্ক, সেখানে একটা ছেলে বা মেয়ে বসে থাকে, কম্পিউটার নিয়ে– প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। সার্ভিসগুলো দিচ্ছে। যেই সেবাই হোক– কর, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট নবায়ন, জমি সংক্রান্ত– সব অনলাইনে। এই কয়েক মাসে আমরা সব মন্ত্রণালয়কে প্রস্তুত করেছি।” রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যত কী? এরকম প্রশ্নে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এই প্রশ্নটা আমি দায়িত্বে এসেই তুলেছি। রোহিঙ্গাদের নিয়ে শুধু বলা হয়, কে তাদের খাবারের টাকা দিচ্ছে, কে শিশুদের পড়াশোনার খরচ দিচ্ছে। এর বাইরে কেউ কিছু বলে না। আমি বললাম– তারপর কী? কেউ উত্তর দেয় না। আমি বললাম, এই প্রশ্নটা করতে হবে– তারা কবে ফিরে যাবে? তাদের ভবিষ্যত কী? জাতিসংঘে গিয়ে আমি দাতা দেশগুলোর আলাদা একটা বৈঠক ডাকি। “তাদের বললাম, আপনারা একটা রোডম্যাপ করেন– তারা কবে ফিরে যাবে? তারা বলল, ’আমরা এখনো করিনি’। আমি বললাম, করুন। ধরুন ১০ বছর লাগবে, ২০ বছর লাগবে– তাও একটা তারিখ দিন। প্রতিবছর একটা বছর কমবে। আমরা কাজ করছি তাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে। কিন্তু তার মধ্যেই সমস্যা শুরু হয়েছে। আমেরিকা হঠাৎ করে সব সাহায্য বন্ধ করে দিল। ইউএসএইডের টাকা বন্ধ। ”আগে একজন রোহিঙ্গা ১২ ডলার পেত খাবার খরচ, এখন সেটা কমে হলো ৬ ডলার, তারপর হলো ৩ ডলার। ৩ ডলারে একজন মানুষ মাসে কী খাবে? আবার সংগঠিত করছি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলছি—তোমরা বলেছিলে আমাদের রাখতে, আমরা রেখেছি, কিন্তু চালানোর দায়িত্ব ছিল তোমাদের। দয়া করে সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যেও না।” ইউনূস বলেন, ‘‘আমরা সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলাদা বৈঠক করার আহ্বান জানিয়েছি। এদিকে মিয়ানমারে রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। রাখাইন রাজ্য এখন আরাকান আর্মির দখলে। ওখানে আবার নতুন রোহিঙ্গা ঢুকছে বাংলাদেশে। ১২ লাখ থেকে

বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা: নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজন

বিশ্বের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তি বিশ্বের ৫০ শতাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছেন, যেখানে নিম্ন-আয়ের ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে মাত্র ২ শতাংশ সম্পদ রয়েছে। এই বৈষম্য সামাজিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অদক্ষতার জন্ম দিচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি একটি নাজুক ও অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি, ঋণের বোঝা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের মতো জটিল সমস্যাগুলো এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। এই সমস্যাগুলো কেবল সাময়িক নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ত্রুটি ও অপরিকল্পিত নীতির ফল। অর্থনীতিবিদ বেন রিডলি সম্প্রতি আল জাজিরায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধে এই সংকটের কারণ এবং একটি ন্যায্য, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। সংকটের মূল কারণ বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে বহুমুখী সংকটের সম্মুখীন। এই সংকটগুলোর মধ্যে রয়েছে: ১. মুদ্রাস্ফীতি এবং সুদের হার বৃদ্ধি: ২০২২-২০২৪ সালে বিশ্বের অনেক দেশে মুদ্রাস্ফীতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বব্যাপী গড় মুদ্রাস্ফীতি ৬.৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান সুদের হার বাড়িয়েছে, যা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করছে। ২. বৈশ্বিক ঋণের বোঝা: বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য অনুসারে, বিশ্বব্যাপী ঋণের পরিমাণ ৩০৫ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রায় ৩৩০০ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৩৩০ শতাংশ। উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষ করে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, এই ঋণের বোঝায় জর্জরিত। শ্রীলঙ্কা (২০২২) ও জাম্বিয়ার (২০২০) মতো দেশ ঋণ খেলাপির শিকার হয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে। ৩. ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা: রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি যোগ করেছে। এই যুদ্ধ জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়িয়েছে, যা নিম্ন-আয়ের দেশগুলোর জন্য বিপর্যয়কর। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ৩৪.৫ কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি। ৪. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: জলবায়ু পরিবর্তন এখন অর্থনীতির জন্য একটি গুরুতর হুমকি। ২০২৩ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশ্বব্যাপী ৩৮০ বিলিয়ন ডলারের ( ৪২ লাখ কোটি) ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কৃষি, অবকাঠামো এবং জনজীবনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় রিমালের কারণে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই ধরনের দুর্যোগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ না দিয়ে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে। ৫. বৈষম্যের বৃদ্ধি: অক্সফামের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তি বিশ্বের ৫০ শতাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছেন, যেখানে নিম্ন-আয়ের ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে মাত্র ২ শতাংশ সম্পদ রয়েছে। এই বৈষম্য সামাজিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অদক্ষতার জন্ম দিচ্ছে। প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা মূলত নব্য-উদারবাদী পুঁজিবাদ এবং বিশ্বায়নের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, তার দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট। ২০০৮ সালের বিশ্ব আর্থিক সংকট এই ব্যবস্থার ঝুঁকিগুলো প্রকাশ করেছিল, যখন ব্যাংকিং খাতের অতিরিক্ত ঝুঁকি এবং নিয়ন্ত্রণহীন আর্থিক বাজার বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দেয়। এরপর কোভিড-১৯ মহামারী সরবরাহ শৃঙ্খল ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, মহামারীর সময় চীনের লকডাউনের কারণে সেমিকন্ডাক্টরের ঘাটতি বিশ্বব্যাপী অটোমোবাইল শিল্পে সংকট সৃষ্টি করে। এছাড়া, প্রচলিত অর্থনৈতিক মডেল পরিবেশের ওপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি করছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অত্যধিক ব্যবহার জলবায়ু সংকটকে তীব্র করছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, পরিবেশগত বিপর্যয় বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি। নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা বর্তমান সংকট একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তাকে জোরালো করছে। এই নতুন ব্যবস্থার লক্ষ্য হবে: ন্যায্যতা: ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্য কমানো।টেকসইতা: পরিবেশগত ক্ষতি কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।অন্তর্ভুক্তিমূলক: সকল সামাজিক গোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী, সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা।নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কৌশল নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে: ১. করপোরেট নিয়ন্ত্রণ ও কর সংস্কার: বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর কর ফাঁকি এবং শ্রম শোষণ রোধে কঠোর নীতি প্রণয়ন করতে হবে। ২০২১ সালে ওইসিডি/জি২০-এর উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী ন্যূনতম করপোরেট কর (১৫ শতাংশ) চালু করা হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে, এই নীতির বাস্তবায়ন এবং আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। ২. ঋণ ত্রাণ ও উন্নয়ন সহায়তা: উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণের বোঝা কমাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোকে ঋণ মওকুফ বা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, জি২০-এর ডেট সার্ভিস সাসপেনশন ইনিশিয়েটিভ (ডিএসএসআই) ২০২০-২০২১ সালে ৪৬টি দেশকে ১২.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ স্থগিত করতে সাহায্য করেছে। ২. সবুজ অর্থনীতির প্রসার: নবায়নযোগ্য শক্তি, টেকসই কৃষি এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ভারতে বায়ু শক্তি প্রকল্প এই দিকে অগ্রগতির উদাহরণ। ৩. ন্যায্য বাণিজ্য নীতি: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং অন্যান্য সংস্থাগুলোকে এমন বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে। বর্তমানে, উন্নত দেশগুলোর ভর্তুকি এবং বাণিজ্য বাধা দরিদ্র দেশগুলোর কৃষি ও শিল্প পণ্যের বাজার প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করছে। ৪. সামাজিক উদ্যোগ ও সহযোগিতামূলক অর্থনীতি: সামাজিক উদ্যোগ এবং সহযোগিতামূলক অর্থনীতির মডেল, যেমন মাইক্রোফাইন্যান্স এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক ব্যবসা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংক এবং ভারতের আমুল কো-অপারেটিভ এই ধরনের মডেলের সফল উদাহরণ। সম্মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্ব নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়তে সরকার, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি। যুব সমাজের আন্দোলন, যেমন গ্রেটা থুনবার্গের ফ্রাইডে ফর ফিউচার বা বাংলাদেশের জলবায়ু আন্দোলন, এর উদাহরণ। এছাড়া, প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বচ্ছ আর্থিক লেনদেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা উন্নত করা যেতে পারে। তবে, এই প্রযুক্তিগুলোর অপব্যবহার রোধে নীতিগত কাঠামো প্রয়োজন। সংকটকে সুযোগে রূপান্তর বর্তমান সংকটকে একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ইতিহাসে বড় সংকটগুলো প্রায়ই নতুন ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৩০-এর মহামন্দার পর কেইনসীয় অর্থনীতি এবং ব্রেটন উডস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একইভাবে, বর্তমান সংকট আমাদের একটি ন্যায্য ও টেকসই অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। পরিশেষে বলা যায় বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অস্থিরতা একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। মুদ্রাস্ফীতি, ঋণ, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় প্রচলিত অর্থনৈতিক মডেল আর কার্যকর নয়। একটি নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি, যা ন্যায্যতা, টেকসইতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলকতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। এই পরিবর্তনের জন্য সরকার, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। যদি আমরা এখনই সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারি, তবে বিশ্ব অর্থনীতি কেবল স্থিতিশীলতাই অর্জন করবে না, বরং একটি নিরাপদ, সমতাভিত্তিক এবং টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতির ‘সমন্বিত’ নীতিমালা

সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মচারীদের জন্য একটি সমন্বিত পদোন্নতি নীতিমালা চালু করেছে। এ উদ্দেশ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য আলাদা এবং বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। আগে প্রতিটি ব্যাংক নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী পদোন্নতি দিত, কিন্তু এখন একই মানদণ্ডে সব প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কর্মচারী পদোন্নতি নীতিমালা-২০২৫’ এবং ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মচারী পদোন্নতি নীতিমালা-২০২৫’ নামে দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কার্যপদ্ধতি আলাদা হওয়ায় তাদের জন্য পৃথক নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল)। এদের জন্য প্রযোজ্য হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকের পদোন্নতি নীতিমালা। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফিন্যান্স করপোরেশনের জন্য প্রযোজ্য হবে বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা। একই সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের ব্যাংকভেদে ভিন্ন সময়ে পদোন্নতি হত। এখন সমন্বিত নীতিমালা চালু হওয়ায় সরকারের আশা, সব ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান একই সময়ে পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে। এ নীতিমালা অনুযায়ী সিনিয়র অফিসার থেকে উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পর্যন্ত পদোন্নতি দেওয়া হবে। পদোন্নতির জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কমিটি এবং সহায়ক কমিটি গঠন করা হবে। পদোন্নতির জন্য যে কোনো ধরনের তদবির বা সুপারিশ করা হলে তা ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে। পদোন্নতি দেওয়া হবে শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির সন্তোষজনক রেকর্ড, মেধা, কর্মদক্ষতা, প্রশিক্ষণ, সততা এবং জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে। স্নাতক ডিগ্রি ছাড়া কেউ পদোন্নতির যোগ্য হবেন না। ফিডার পদে শেষ তিন বছরের মধ্যে যে কোনো এক বছরের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) যদি সন্তোষজনক না হয়, তবে প্রার্থী পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হবেন না। যদি কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলছে, বিভাগীয় মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে দণ্ডকাল চলমান থাকে, অথবা ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হন, তবে তাকে পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হবে না। পদোন্নতির জন্য মোট ১০০ নম্বর বরাদ্দ করা হয়েছে। এসিআর-এর ৫ বছরের গড় নম্বর পাবে ৪৫, শিক্ষাগত যোগ্যতায় ১৫, ফিডার পদে চাকরির সেবাকালে ১৫, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় ৪, ব্যাংকিং প্রফেশনাল পরীক্ষা (ব্যাংকিং ডিপ্লোমা) এ ১০, দুর্গম এলাকায় কাজের অভিজ্ঞতায় ১, শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজের অর্জনে ২ এবং সাক্ষাৎকার বা মৌখিক পরীক্ষায় ৮ নম্বর দেওয়া হবে। মৌখিক পরীক্ষায় অন্তত ৪ নম্বর পেতে হবে এবং বাকি ৯২ নম্বরের মধ্যে কমপক্ষে ৭৫ নম্বর পেতে হবে। এ দুটি নম্বর যোগ করে মেধাতালিকা তৈরি করা হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে পদোন্নতির ভিত্তিকাল হবে ৩১ ডিসেম্বর, আর বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে হবে ৩০ জুন। বাণিজ্যিক ব্যাংকে ডিজিএম পদে পদোন্নতির জন্য ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হবে, যার সভাপতি হবেন ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের চেয়ারম্যান। এজিএম পদে পদোন্নতির জন্য কমিটির সভাপতি হবেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। সিনিয়র অফিসার থেকে ডিজিএম পদে পদোন্নতির জন্য এমডি বাছাই কমিটি ও সহায়ক কমিটি গঠন করবেন। অন্যদিকে, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সিনিয়র অফিসার থেকে ডিজিএম পদে পদোন্নতির জন্য কমিটির সভাপতি হবেন এমডি, আর পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটির সভাপতি হবেন ডিএমডি (প্রশাসন)। প্রয়োজনে এমডি নীতিমালা অনুযায়ী একাধিক বাছাই কমিটি গঠন করতে পারবেন। নীতিমালায় যে কোনো অস্পষ্টতা দেখা দিলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হবে। এই নতুন নীতিমালা চালু হওয়ায় পদোন্নতি প্রক্রিয়া হবে আরও স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং সমতাভিত্তিক।

  • 0
  • 0
© 2025 Dhumketu . All Rights Reserved. || Created by FixiFite WEB SOLUTIONS.