২০শে এপ্রিল, ২০২৬, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩

সাহিত্য যেখানে শিল্পের বা বুদ্ধিমত্তার আঁচ পাওয়া যায় ।। সাহিত্য সমাজের দর্পণ

সাহিত্য যা মানুষকে আনন্দ দেয়, মানুষের মনের খোরাক যোগায়, মানুষের অন্তর্দৃষ্টিকে প্রসারিত করতে সাহায্য করে সাহিত্যকে বলা হয় মানব ও সমাজ জীবনের দর্পণ বা প্রতিচ্ছবি। মানবজীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। সাহিত্যে মানব মনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা এবং মানবজীবনের শাশ্বত ও চিরন্তন অনুভূতি প্রতিফলিত হয়। ”সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বলেছেন-”অন্তরের জিনিসকে বাহিরের, ভাবের জিনিসকে ভাষার, নিজের জিনিসকে বিশ্বমানবের ও ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলাই সাহিত্যের কাজ।”সাহিত্যের পরিধিও ব্যাপক। মানুষের কল্যাণের জন্য যাঁরা জগতে যত বাণী উচ্চারণ করেছেন; যেমন- ধর্মগ্রন্থে স্রষ্টার বাণীসমূহ এবং মনীষী বা মহামানবদের কল্যাণমূলক সকল বাণীই সাহিত্যের পর্যায়ভুক্ত। ডাঃ লুৎফর রহমান সাহিত্যের এ ব্যাপকতাকে লক্ষ্য করে স্মরণযোগ্য একটি মন্তব্য করেছেন। মন্তব্যটি হলো-”জীবনের কল্যাণের জন্য, মানুষের সুখের জন্য এ জগতে যিনি যত কথা বলিয়া থাকেন,- তাহাই সাহিত্য। সাহিত্য বলতে যথাসম্ভব কোনো লিখিত বিষয়বস্তুকে বুঝায়। সাহিত্য শিল্পের একটি অংশ বলে বিবেচিত হয়, অথবা এমন কোনো লেখনী, যেখানে শিল্পের বা বুদ্ধিমত্তার আঁচ পাওয়া যায়, অথবা যা বিশেষ কোনো প্রকারে সাধারণ লেখনী থেকে আলাদা৷ মোটকথা, ইন্দ্রিয় দ্বারা জাগতিক বা মহাজাগতিক চিন্তা চেতনা, অনুভূতি, সৌন্দর্য ও শিল্পের লিখিত বা লেখকের বাস্তব জীবনের অনুভূতি হচ্ছে সাহিত্য। ধরন অনুযায়ী সাহিত্যকে কল্পকাহিনি বা বাস্তব কাহিনি কিংবা পদ্য, গদ্য এই দুইভাগে ভাগ করা যায়। পদ্যের মধ্যে ছড়া, কবিতা ইত্যাদি, গদ্যের মধ্যে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি শাখা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এছাড়াও অনেকে নাটককে আলাদা প্রধান শাখা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেন। নাটকের মধ্যে নাটিকা, মঞ্চনাটক ইত্যাদিকে ভুক্ত করা যায়। সাহিত্য বলতে কোন লিখিত বিষয়বস্তুকে বোঝায়। সাহিত্য শিল্পের একটি অংশ বলে বিবেচিত হয়, অথবা এমন কোন লেখনি যেখানে শিল্পের বা বুদ্ধিমত্তার আঁচ পাওয়া যায়, অথবা যা বিশেষ কোন প্রকারে সাধারণ লেখনি থেকে আলাদা। মোটকথা ইন্দ্রিয় দ্বারা জাগতিক বা মহাজাগতিক চিন্তা, চেতনা, অনুভূতি, সৌন্দর্য ও শিল্পের লিখিত বা লেখকের বাস্তব জীবনের অনুভূতি হচ্ছে সাহিত্য। ধরন অনুযায়ী সাহিত্যকে কল্পকাহিনি বা বাস্তব কাহিনি কিংবা পদ্য, গদ্য এই দুইভাগে ভাগ করা যায়। পদ্যের মধ্যে ছড়া, কবিতা ইত্যাদি, গদ্যের মধ্যে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি শাখা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এছাড়াও অনেকে নাটককে আলাদা প্রধান শাখা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেন। একজন লেখক সমাজনীতি রাজনীতি ও সংসারনীতি থেকে শুরু করে সবকিছু নিয়ে লেখেন। সকল বিষয় তার লেখার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সকল লেখক তার নিজের সংসারে রাজা হতে পারেন না। কারণ সংসার মানে কাজ আর লেখক মানে একজন ভাবুক মানুষ। কাজ করতে গেলে ভাববেন কখন? না ভাবলে লিখবেন কী করে! সাহিত্যিক হতে হলে পড়তে হয়। পড়তে হয় বই। পড়তে হয় বিশ্বজগৎ। পড়তে হয় মানুষকেও। একজন লেখক হলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি বিভিন্ন ধরনের এবং কৌশলের লিখিত শব্দগুলি যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করেন। লেখকরা বিভিন্ন ধরনের সাহিত্য শিল্প এবং সৃজনশীল লেখার জন্মদান করেন, যেমন উপন্যাস, ছোট গল্প, কবিতা, নাটক, চিত্রনাট্য এবং প্রবন্ধ পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিবেদন গুলি এবং খবর নিবন্ধ যার প্রতি জনগণ আগ্রহী হতে পারে। লেখকদের লেখা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। দক্ষ লেখক, যাঁরা ভাষার মাধ্যমে ধারণাকে ভালভাবে প্রকাশ করতে ব্যবহার করতে সক্ষম হন, একটি সমাজের সংস্কৃতিতে তাঁদের অবদান অপরিসীম। চারুকলার ক্ষেত্রে “লেখক” শব্দটি অন্য কোথাও ব্যবহৃত হয় – যেমন গীতি লেখক – তবে শুধু “লেখক” বললে সাধারণত, যিনি লিখিত ভাষা তৈরি করেন, তাঁকে বোঝায়। কিছু লেখক মৌখিক প্রথা থেকে কাজ করেন। লেখকরা কাল্পনিক বা বাস্তব বেশ কয়েকটি রীতির উপাদান তৈরি করতে পারেন। অনেক লেখক তাঁদের ধারণাকে সবার কাছে পৌঁছে দেবার জন্য একাধিক মাধ্যম ব্যবহার করেন – উদাহরণস্বরূপ, গ্রাফিক্স বা চিত্রণ। নাগরিক এবং সরকারী পাঠকদের দ্বারা, অ-কাল্পনিক প্রযুক্তিবিদদের কাজের জন্য, সাম্প্রতিক আরেকটি চাহিদা তৈরি হয়েছে, যাদের দক্ষতা ব্যবহারিক বা বৈজ্ঞানিক প্রকৃতির বোধগম্য, ব্যাখ্যামূলক দস্তাবেজ তৈরি করে। কিছু লেখক তাঁদের লেখাকে আরও বোধগম্য করার জন্য চিত্র (অঙ্কন, চিত্রকর্ম, গ্রাফিক্স) বা মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করতে পারেন। বিরল দৃষ্টান্তে, সৃজনশীল লেখকগণ তাঁদের ধারণাগুলি সংগীতের পাশাপাশি শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করতে সক্ষম হন।লেখকের স্ত্রীবাচক শব্দ হচ্ছে লেখিকা। লেখককে অনেকক্ষেত্রে গ্রন্থকারের সমার্থক শব্দরূপে গণ্য করা হয়। কিন্তু লেখক শব্দটি মূলতঃ ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। তাঁদের নিজস্ব রচনাগুলি সৃষ্টির পাশাপাশি, লেখকরা প্রায়শই ‘কীভাবে’ তাঁরা লেখেন সেটাও প্রকাশ করেন (অর্থাৎ, যে প্রক্রিয়াটি তাঁরা লেখার জন্য ব্যবহার করেন);কেন তাঁরা লেখেন (অর্থাৎ তাদের প্রেরণা কি); এবং অন্যান্য লেখকের কাজের বিষয়েও মন্তব্য (সমালোচনা) করেন। লেখকরা পেশাদার বা অপেশাদারভাবে কাজ করেন, অর্থাৎ, অর্থের জন্য বা অর্থ ছাড়াই, এছাড়াও অগ্রিম অর্থ গ্রহণ করে (বা কাজ শেষ করার পর), বা কেবল তাঁদের কাজ প্রকাশিত হবার পরে। অর্থ প্রাপ্তি লেখকদের অনেক অনুপ্রেরণার মধ্যে একটি, অনেকে তাঁদের কাজের জন্য কখনও কোন অর্থই পান না। লেখক শব্দটি প্রায়শই সৃষ্টি মূলক লেখক এর প্রতিশব্দ হিসাবে ব্যবহৃত হয়, যদিও পরবর্তী শব্দটির কিছুটা বিস্তৃত অর্থ রয়েছে এবং লেখার কোনও অংশের জন্য আইনি দায়িত্ব জানাতে ব্যবহৃত হয়, এমনকি এর রচনাটি বেনামে, অজানা বা সহযোগী হলেও। আমরা সাহিত্য খুঁজি আদি নিদর্শন চর্যাপদে বা মধ্যযুগের কিছু বইতে বা যারা প্রতিষ্ঠিত লেখকের স্বীকৃতি পেয়েছেন শুধু তাঁদের লেখায়। কিন্তু তারও আগের প্রাচীন কালের গ্রন্থ যুগযুগ ধরে সবাইকে আলো দিয়ে চলেছে।  বিস্ময়ের বিষয় হলো- যে বইটি সর্বোত্তম সাহিত্যের উপাদান নিয়ে সারা পৃথিবীজুড়ে সব সময় শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা নিয়ে জগতে আলোড়ন তুলে চলেছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। সেই গ্রন্থে জগতের শুরু থেকে শেষ বিজ্ঞান মানবজাতির সকল কিছু সত্য-মিথ্যা, কাব্য-সাহিত্য, অর্থ-বিত্ত, ছোট-বড়, ধনী-গরিব সবার কথা অকপটে ঘোষিত হয়েছে।  গল্প বলার আবির্ভাব ঘটে যখন মানুষের মন কার্যকারণ যুক্তি এবং গঠন ঘটনাগুলিকে একটি আখ্যান এবং ভাষায় প্রয়োগ করার জন্য বিকশিত হয়েছিল , যা প্রাথমিক মানুষের একে অপরের সাথে তথ্য ভাগ করে নেওয়ার অনুমতি দেয়। প্রাথমিক গল্প বলা শ্রোতাদের বিনোদন দেওয়ার পাশাপাশি বিপদ এবং সামাজিক নিয়ম সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিয়েছে ।  মেসোপটেমিয়ায় প্রায় ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ, প্রাচীন চীনে প্রায় ১২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং মেসোআমেরিকাতে প্রায় ৬৫০খ্রিস্টপূর্বাব্দে বিশ্বের বিভিন্ন অংশে স্বাধীনভাবে লেখার ইতিহাস শুরু হয়েছিল। সাহিত্য প্রাথমিকভাবে লিখিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, কারণ এটি প্রাথমিকভাবে অ্যাকাউন্টিং এর মতো সহজ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত । সাহিত্যের প্রাচীনতম জীবিত কাজগুলির মধ্যে রয়েছে দ্য ম্যাক্সিমস অফ পাতাহোটেপ এবং প্রাচীন মিশরের ওয়েনামুনের গল্প , মেসোপটেমিয়া থেকে শুরুপ্পাক এবং নিপপুরের দরিদ্র মানুষের নির্দেশনা এবং প্রাচীন চীনের ক্লাসিক অফ পোয়েট্রি ।  পদ্য (ইংরেজি: Poetry) হলো সাহিত্যিক ধারার একটি রূপ, যা কোনো অর্থ বা ভাব প্রকাশের জন্য গদ্যছন্দে প্রতীয়মান অর্থ না ব্যবহার করে ভাষার নান্দনিক ও ছন্দোবদ্ধ গুণ ব্যবহার করে থাকে।পদ্যে ছন্দোবদ্ধ বাক্য ব্যবহারের কারণে গদ্য থেকে ভিন্ন। গদ্য বাক্য আকারে লেখা হয়, পদ্য ছত্র আকারে লেখা হয়। গদ্যের পদবিন্যাস এর অর্থের মাধ্যমে বুঝা যায়, যেখানে পদ্যের পদবিন্যাস কবিতার দৃশ্যমান বিষয়বস্তুর উপর নির্ভরশীল। গদ্য হলো ভাষার একটি রূপ, যা সাধারণ পদবিন্যাস ও স্বাভাবিক বক্তৃতার ছন্দে লেখা হয়।গদ্যের ঐতিহাসিক বিকাশ প্রসঙ্গে রিচার্ড গ্রাফ লিখেন, “প্রাচীন গ্রিসের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় যে, গদ্য তুলনামূলকভাবে অনেক পরে বিকশিত হয়েছে, এই “আবিষ্কার” ধ্রুপদী যুগের সাথে সম্পর্কিত।” নাটক হলো এমন এক ধরনের সাহিত্য, যার মূল উদ্দেশ্য হলো তা পরিবেশন করা।সাহিত্যের এই ধারায় প্রায়ই সঙ্গীত ও নৃত্যও যুক্ত হয়, যেমন গীতিনাট্য ও গীতিমঞ্চ। মঞ্চনাটক হলো নাটকের একটি উপ-ধরন, যেখানে একজন নাট্যকারের লিখিত নাটকীয় কাজকে মঞ্চে পরিবেশন করা হয়ে থাকে। এতে চরিত্রগুলোর সংলাপ বিদ্যমান থাকে এবং এতে পড়ার পরিবর্তে নাটকীয় বা মঞ্চ পরিবেশনা হয়ে থাকে। সুমেরীয় সাহিত্য সুমেরীয় সভ্যতা দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ করা ধর্মীয় লেখা এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী গল্প সহ এবং পরবর্তী আক্কাদিয়ান এবং ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য দ্বারা সংরক্ষিত সহ নথিভুক্ত সাহিত্যের প্রাচীনতম পরিচিত উপাদান গঠন করে। এই রেকর্ডগুলি মধ্য ব্রোঞ্জ

সাহিত্য ও শিল্পের উপেক্ষিত উপকরণ

সাহিত্য ও শিল্পের কাজ হলো মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করা–মনকে শুধু মুগ্ধ করা নয়, হৃদয়কে জাগিয়ে তোলাও। যে সব শাশ্বত আদর্শ ও গভীর ভাবধারা কালের পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়েছে, সে সব ভাব ও আদর্শ যদি সাহিত্য-শিল্পে রূপলাভ করে, তা যে শুধু সহজে মানব হৃদয়ে প্রবেশ করে তা নয়, হৃদয়ের পটে কায়েমি-ভাবে দাগ কাটতেও তা হয় সক্ষম এবং এভাবেই গড়ে ওঠে ব্যক্তি-চরিত্র ও মানস। মানুষের আধ্যাত্মিক অনুভূতি ও ধ্যান-ধারণা ইতিহাসের সূচনায় এক একটা লৌকিক ধর্মাদর্শকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। বলাই বাহুল্য, দেশভেদে ও কালভেদেও ধর্মাদর্শের ও তার অনুষ্ঠানাদির রূপান্তর ঘটেছে নানাভাবে। আর ধর্মাদর্শকে ভিত্তি করে, ভিন্ন ভিন্ন। ভৌগোলিক পরিবেশে নানা সংস্কৃতি যে দানা বেঁধেছে এ বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই। এ সব ধর্মাদর্শ ও সাংস্কৃতিক রূপায়ণ বিভিন্ন ব্যক্তি ও অনুষ্ঠানে যেভাবে রূপ পরিগ্রহ করছে–হয়তো তা নিছক কল্পনা, হয়তো তা চূড়ান্ত বিকৃতি, তবুও সামাজের বৃহত্তর অংশকে এ সবই প্রেরণা দিয়ে এসেছে, জুগিয়েছে জন-মনের খোরাক। দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে রামায়ণ, মহাভারত, জাতক কাহিনীর কথা, পুঁথি ও সাহিত্যের বিচিত্র কাহিনী, কাসাসুল আম্বিয়া, তাজকেরাতুল আওলিয়া বা খ্রিস্টীয় সেন্টদের কথা। সত্যের চেয়েও সত্যকে কেন্দ্র করে মানুষের অর্থাৎ শিল্পী-সাহিত্যিকের যে কল্পনার জগৎ গড়ে উঠেছে তার মূল্য ও আকর্ষণ অনেক বেশি, তার প্রভাব ও আবেদনও ব্যাপকতর। গীতা-উপনিষদের চেয়ে রামায়ণ-মহাভারতের প্রভাব যে অনেক বেশি কে তা অস্বীকার করতে পারে? রামায়ণ-মহাভারতে আমরা রক্তমাংসের মানুষকেই দেখতে পাই। তাদের পাপ-পুণ্য মানুষেরই পাপ-পুণ্য। তাই সহজেই তারা মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ লাভ করে। এখানেই ধর্মগ্রন্থের ওপর সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্ব। ধার্মিকের চেয়ে সাহিত্য-রসিক যে মানুষ হিসেবে অনেক বড় এ বিষয়ে বোধ করি দ্বিমত নেই। ইসলামের ধর্মীয় ও আধা ধর্মীয় ঘটনা ও কাহিনীগুলি এখনো যথাযথভাবে সাহিত্য শিল্পের উপরকণ হতে পারে নি। সামাজিক গোঁড়ামি ও অসহিষ্ণুতাই তার বড় কারণ। ফলে সাহিত্য-শিল্পের এ দিকটা উপেক্ষিত ও দরিদ্রই রয়ে গেছে। ধর্মাদর্শ ও ভাবধারা সাহিত্য-শিল্পের মাধ্যমে রূপায়িত না হলে তা নেহাত কেতাবি ও মৌখিক বুলিতেই পর্যবসিত হয়ে থাকে। তাই আমাদের তথাকথিত ধার্মিকরাও মানুষ হিসেবে অত্যন্ত খণ্ডিত, ভারসাম্যহারা ও রসবোধহীন। হিন্দু তার দেব-দেবীকে নতুন করে সৃষ্টি করতে পারে শিল্পে, ভাস্কর্যে, স্থাপত্যে, নাটকে, নভেলে। নিত্য নতুনভাবে রূপায়িত করে তাকে জীবনের সামগ্রী করে নিতে তার কোনো বাধা নেই। বৌদ্ধরাও তা করতে পারে–বুদ্ধ ও বুদ্ধ-জীবন নিয়ে কত অসংখ্য শিল্প-কলাই না দেশ বিদেশে গড়ে উঠেছে। খ্রিস্টানরাও তাই করে। খ্রিস্ট ও মেরির জীবন নিয়ে কত অসংখ্য শিল্প যে সৃষ্টি হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। যে কোনো শিল্প-বস্তুর যে প্রেরণা তার রস তথা আনন্দের সম্পর্ক রয়েছে–তাই সহজে তা মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে ও নাড়া দেয়। সৃষ্টির আনন্দের চেয়ে বড় আনন্দ আর নেই। ভক্ত ও ত্যাগীদের জীবন যুগে যুগে শিল্প-সৃষ্টির এক বড় উপাদান যুগিয়ে এসেছে। জনসাধারণ এভাবে শিল্পের মাধ্যমে, আনন্দ উপভোগের সঙ্গে সঙ্গে মহৎ জীবনকে নিজস্ব করে নেওয়ার একটা সুযোগ লাভ করে এবং ধর্ম ও নীতিও এভাবে শিল্পের মাধ্যমে সার্থক হয়ে ওঠে। বলা বাহুল্য, শিল্প শুধু জীবনের রূপায়ণ নয়, মহৎ জীবনের প্রতিফলনও। দক্ষিণ জার্মানিতে খ্রিস্টের শেষ জীবন নিয়ে যে passion play হয়, তাতে খ্রিস্ট জীবনের চরম ত্যাগকে লোকচক্ষুর সামনে রূপ দেওয়া হয় নাটকের আকারে এবং প্রতি দশ বছর অন্তর তা অভিনীত হয়। এ দশ বছর ধরে চলে তার প্রস্তুতি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও অভিনয় দেখতে গিয়েছিলেন এবং দেখে অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছিলেন। এ নাটকে যিনি খ্রিস্টের ভূমিকায় অভিনয় করবেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে খ্রিস্টের ভাবাদর্শে জীবন যাপন করতে চেষ্টা করেন এবং এভাবে দীর্ঘ সাধনায় নিজেকে সে ভূমিকার যোগ্য করে গড়ে তোলেন। আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার লোক হজ্জ্ব করতে ও হযরতের। রওজা শরিফ জেয়ারত করতে মক্কা-মদিনা গিয়ে থাকেন। তাদের একজনও কি হযরতের ভাবাদর্শে জীবন যাপনের এক শতাংশ চেষ্টাও করে থাকেন? হযরতের জীবন ও ভাবাদর্শকে সাহিত্য-শিল্পের রস-রূপ করে দিয়ে, আনন্দের সামগ্রী করে তাদের সামনে কখনো পরিবেশন করা হয় নি ফলে তা হৃদয়ের সিংহদ্বার পর্যন্ত ও পৌঁছতে পারে না। তারা শুধু ধর্মের আদেশটুকুই পালন করে, তাকে হৃদয় মনের বস্তু করে নেয় না, নিতে পারে না। শিল্প ও সাহিত্যের ভেতর দিয়ে অন্যান্য ধর্মের ভাবুকদের জীবন যেমন অনেকের মন-মানসের ও ধ্যানের বস্তু হয়ে উঠেছে, ইসলামের বেলায় তা হয় নি। ইসলামের মহাপুরুষদের জীবন নিয়ে ও ধর্মীয় কাহিনী অবলম্বনে চিত্রকলা ও ভাস্কর্য গড়ে ওঠে নি। গড়ে ওঠে নি নাটক-নভেল। ঐ সব জীবন ও কাহিনী রূপায়িত হয় নি যাত্রা ও অভিনয়ে। তাই হয় নি ঐ সব এখনো জন-চিত্তের খোরাক। কারবালার ঘটনার মতো এমন চমৎকার মহাকাব্য বা নাটকীয় উপাদানও ব্যবহার হতে পারে নি রঙ্গমঞ্চে বা ছায়াছবির পর্দায়। একদা স্বয়ং মধুসূদন তার বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে লিখেছিলেন, ‘ভারতের মুসলমানদের মধ্যে যদি কোনো বৃহৎ কবির উদ্ভব হইত, হাসান ও তাঁহার ভ্রাতার মৃত্যুকে অবলম্বন করিয়া কী বিরাট এপিক লেখাই না তাঁহার পক্ষে সম্ভব ছিল। সমস্ত জাতির অনুভূতিকে সে নিজের পক্ষে টানিতে পারি। আমাদের এমন কোনো বিষয় নাই।’ এপিক তথা মহাকাব্যের যুগ অতীত হয়েছে–এখন নাটক-নভেল ও ছায়াছবির যুগ। মহাকাব্যের জন্য যেমন মহা প্রতিভার দরকার, এ সবের জন্য তেমন প্রতিভা না হলেও চলে। কাজেই এ সব উপকরণকে এখন যুগোপযোগী আঙ্গিকেও রূপ দেওয়া যেতে পারে। মুসলমানদের শিল্প-বোধ ও সৃষ্টি প্রতিভা অন্য কোনো রকমে মুক্তি না পেয়ে তা শুধু মসজিদ ও স্মৃতিসৌধেই চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। কিন্তু এ সবের পরিধি অত্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং তা সাধারণ শিল্পীর সাধ্য ও আয়ত্বের অতীত। ব্যক্তিগত ও সাধারণ জীবনের পরিধিতে শিল্প যদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে রূপ-লাভ না করে, বৃহত্তর জীবনে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। বলা বাহুল্য, সাহিত্য-শিল্পের জন্য কোনো উপকরণই পুরোনো বা বাসি নয়–আঙ্গিক ও রূপ অর্থাৎ form নতুন হতে পারে। নতুন আঙ্গিকে ও নতুন রূপে বহু পুরোনো উপকরণকেই প্রতিভাবান সাহিত্যিক-শিল্পীরা যে অতি সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন, সাহিত্য-শিল্পের ইতিহাসে তার দৃষ্টান্তের কোনো অভাব নেই। [‘সাহিত্য ও শিল্পের উপক্ষিত উপকরণ’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫০-এর দশকে সাহিত্য সাপ্তাহিক মেঘনায়। প্রথম গ্রন্থাকারে সংকলিত হয় ১৯৬১-তে সাহিত্য ও সংস্কৃতি সাধনায়।]

শিল্প সাহিত্য চর্চায় সাহাবায়ে কেরাম

রাসূল (সা.)-এর খাদেম প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আনাস ইবন মালিক (রা.) বলেন, যখন রাসূল (সা.) আমাদের এখানে (মদিনা) আসেন তখন আনসারদের প্রতিটি গৃহে কবিতা বলা হতো। ইসলামি যুগে দাওয়াতি কাজের জন্য, ব্যক্তি-সাহসকে জাগিয়ে তোলার জন্য, বিভিন্ন দল ও মতের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য এবং শত্রুকে ভয় দেখানো ও বিতাড়নের জন্য খুতবার বেশি প্রয়োজন হওয়ায় সাহিত্যের মর্যাদা বেড়ে যায় [আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন, ২/৯৮]। ইসলামি যুগে শিক্ষার প্রসার হওয়ার এবং প্রয়োজনের তাগিদে পত্র-সাহিত্যের চর্চা শুরু হয়। এ পত্র-সাহিত্যের সূচনা করেন রাসূল (সা.)। পরবর্তীকালে খলিফারা, প্রাদেশিক শাসনকর্তা ও সেনাবাহিনীর কমান্ডাররা নানা ধরনের পত্রের আদান-প্রদান করেছেন, এসব পত্রেরও একটা সাহিত্য মান ও মূল্য আছে। একদা শারিদ ছাকাফি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাহনের পেছনে আরোহী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তার কাছে উমিয়্যার কবিতা শুনতে চাইলেন। তিনি আবৃত্তি করছিলেন, আর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে আরও শোনাতে বলছিলেন। তিনি সেদিন মোট একশটি শ্লোক শুনেছিলেন। মদিনায় হিজরাত পরে কাফেররা কবিতার দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা.), আনসার ও মুহাজিরদের গোত্র, ব্যক্তি চরিত্র ও ইসলামের নিন্দা ও কুৎসা বর্ণনা করতে থাকে। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনার আনসারদের লক্ষ্য করে বলেন, যারা হাতিয়ার দ্বারা আল্লাহ ও তার রাসূলকে সাহায্য করছে, জিহবা দ্বারা সাহায্য করতে কে তাদের বাধা দিয়েছে? এ কথা শুনে হাসসান ইবনে ছাবিত বলেন, আমি এর জন্য প্রস্তুত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমিও তো কুরাইশ বংশের। তুমি কীভাবে তাদের নিন্দা করবে? উত্তরে তিনি বলেন, মথিত আটা থেকে চুল যেভাবে বের করে আনা হয় আমিও তদ্রুপ আপনাকে বের করে আনব। তার জন্য মসজিদে নববিতে একটি মিম্বর স্থাপন করা হয়। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে স্বরচিত কবিতা আবৃতি করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তার কবিতা শুনে বলতেন, ‘আমার পক্ষ থেকে জবাব দাও। হে আল্লাহ রুহুল কুদ্দুসকে দিয়ে তার সাহায্য কর।’ আর রাসূল (সা.) তাকে এ কথাও বলেন যে, তুমি আবু বকরের কাছে গিয়ে কুরাইশদের দোষ-ত্রুটি ও দুর্বল দিকগুলো জেনে নাও। এ সম্পর্কে আবু বকরই অধিক জ্ঞানী। সত্যিই সেদিন হাসসান এ কাজের উপযুক্ত ছিলেন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এ ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, তার এ কবিতা তাদের জন্য তীরের আঘাতের চেয়েও তীব্রতর। এসব কারণেই তিনি সঙ্গতভাবেই ‘শাইরুর রাসূল’ বা রাসূলের কবি নামে খ্যাতি লাভ করেছেন। এ কবিতার সংঘর্ষে অপর যে দুজন কবি তাকে সাহায্য করেন তারা হলেন, কাব ইবন মালিক ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। সিরাতে ইবনে হিশাম পাঠ করলে কবিতার ও লড়াইয়ের একটা চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। ইসলামি সাহিত্যের ইতিহাসে কবি কাব ইবন যুহায়রের ঘটনাটি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ইসলাম শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি যে কত উদার ও এর কত বড় পৃষ্ঠপোষক-এ ঘটনা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। জাহেলি ও ইসলামি যুগের বিশিষ্ট কবি কাব ইবন যুহায়র। তিনি ইসলাম গ্রহণের আগে ইসলাম ও ইসলামের নবির নিন্দামূলক কবিতা রচনা করে রাসূলের বিরাগভাজন হন। রাসূল (সা.) তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। সে ব্যক্তিই যখন ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় এলেন এবং তার বিখ্যাত কাসিদা ‘বানত ‘বানত সূ’আদ’ আবৃত্তি করে রাসূল (সা.)কে শোনান, তখন রাসূল (সা.) তাকে শুধু ক্ষমাই করেননি; বরং খুশির আতিশয্যে তার সৃষ্টির প্রতিদান স্বরূপ নিজ দেহের চাদরটি তাকে উপহার দেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর তার সুযোগ্য খলিফারা ইসলামি রাষ্ট্রের পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। এ যুগেও কবিতাচর্চায় তেমন ভাটা পড়েনি। খোলাফায়ে রাশিদিন সর্বদাই কবিতা আবৃত্তি করতেন। আর রাসূলুল্লাহর (সা.) সাহাবিরা তো মসজিদে নববিতে কবিতা আবৃত্তির আসর বসাতেন [ড. শাওকি দায়ফ, তারিখ আল-আদাব, ২/৪৫]। সাঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব বলেন, আবু বকর (রা.) কবি ছিলেন। উমর (রা.) কবি ছিলেন। আর আলী (রা.) ছিলেন তিনজনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবি [ইবন আবদি বাব্বিহি, আল-ইকদ আল-ফারিদ, ৫/২৮৩]। উমর (রা.) কুরআনের আয়াতের অর্থ বুঝতে কবিতার শরণাপন্ন হতেন। একবার তিনি মিম্বরে ওপর দাঁড়িয়ে সূরা আন-নাহলের ৪৭তম আয়াত পাঠ করেন। তারপর উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামের কাছে আয়াতে উল্লিখিত তাকাউয়ুফিন শব্দটির অর্থ জানতে চান। সাহাবায়ে কেরাম সবাই চুপ থাকলেন। তখন হুযায়ন গোত্রের এক বৃদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন! এটা আমাদের উপভাষা। এর অর্থ অল্প-অল্প নেওয়া। উমর (রা.) বৃদ্ধের কাছে জানতে চাইলেন, আরবরা কি তাদের কবিতা থেকে অর্থ জানতে পারে? অর্থাৎ আরব কবিরা তাদের কবিতায় এ অর্থে শব্দটি প্রয়োগ করেছেন? বৃদ্ধ বললেন, হ্যাঁ আমাদের কবি আবু কাবির আল-হুযালী তার উষ্ট্রীর বর্ণনা দিতে গিয়ে একটি শ্লোকে এ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তারপর বৃদ্ধ শ্লোকটি আবৃত্তি করে শোনান। উমর (রা.) তখন বলেন, তোমরা তোমাদের দিওয়ান সংরক্ষণ করে রাখ, তাহলে তোমরা আর গোমরাহ্ হবে না [ইবন মানসুর, লিসান আ-আরাব-২/১৯৯২]। আলী (রা.) ছিলেন জ্ঞানের ভান্ডার। সে যুগের আরব কবিদের মধ্যে তিনিও একজন শ্রেষ্ঠ কবি। ‘দিওয়ানে আলী, নামক কাব্য সংকলন গ্রন্থটি আজও তার কাব্য প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। আয়েশা (রা.) বলেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের কবিতা শিক্ষা দেবে। এতে তাদের ভাষার আড়ষ্টতা দূর হয়ে সহজ সাবলীল হবে [আল-ইকদ আল-ফারিদ, ৫/২৭৪. ৬/৭]। এভাবে যদি সে যুগের আরবি সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করা হয় তাহলে দেখা যাবে সাহিত্যে চর্চার ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। মূলত সাহাবায়ে কেরামের দুই আদর্শ ছিল আল কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সা.) সুন্নাহ।

  • 0
  • 0
© 2025 Dhumketu . All Rights Reserved. || Created by FixiFite WEB SOLUTIONS.